চতুর্থত্রিশত অধ্যায় — ঘণ্টা বাজল নয়বার, রক্তমাংসের সন্ন্যাসী

সর্ববস্তুর রহস্য উন্মোচন: এক শিশুর দৃষ্টিতে বহু জগত জয় উন্মত্ত আগুনের বাতাসে ছুটে চলা বেলুন 2629শব্দ 2026-03-04 06:00:45

নিঃসংজ্ঞা মঠ।

পিছনের পাহাড়।

ভোরের সময়।

একটি ছোট আঙিনার ভিতর।

জ্ঞানশূন্য ভিক্ষু ধ্যানাসনে বসে আছেন।

তার ঠিক সামনে, ঠিক তেমনই বসে আছে একটি ছোট শিষ্য, দেখতে যেন তিন-চার বছর বয়সী এক ক্ষুদে, বড় বড় চোখ বারবার পলক ফেলছে।

সে পরে আছে একটু ঢিলেঢালা পোশাক, এক হাতে চকচকে মাথা চুলকোচ্ছে, মুখে গভীর উদাসীনতার ছাপ।

‘‘অমিতাভ বুদ্ধ, নির্মল, আজকের প্রাতঃপাঠ হল ষড়াক্ষর মহামন্ত্র, তুমি কি জানো ক’টি শব্দ?’’ জ্ঞানশূন্য ভিক্ষু তার সামনে বসা ক্ষুদে শিষ্যটির দিকে চেয়ে বললেন।

এই ক্ষুদে শিষ্যটি, স্বাভাবিকভাবেই, নিঃসংজ্ঞা মঠে তিন বছর ধরে বসবাস করা রাজশাও।

নির্মল নামটি জ্ঞানশূন্য তার জন্য বেছে নিয়েছেন ধর্মীয় নাম হিসেবে।

নিঃসংজ্ঞা মঠে শিষ্যদের বংশানুক্রমিক নামকরণ হয় ‘‘জ্ঞান, বিশুদ্ধ, সত্য, সমুদ্র’’ এই ধারায়।

কারণ রাজশাও-কে জ্ঞানশূন্য তার নিজস্ব শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাই তার নামের প্রথম অংশে ‘‘নিঃ’’ শব্দটি এসেছে।

বংশানুক্রমিক মর্যাদা হিসেবে যথেষ্ট উঁচু!

রাজশাও চকচকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘‘ষড়াক্ষর মহামন্ত্র—ওঁ, মা, না, বা, মি, হুম। গুরুজী, আপনি কি একটু কঠিন কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারেন না?’’

এই তিন বছরে জ্ঞানশূন্য ভিক্ষু প্রতিদিন রাজশাও-কে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিয়েছেন, নিয়মিত প্রাতঃপাঠ করিয়েছেন।

অবশ্য, রাজশাও যখন দুই বছরের ছিল, তখনই তাকে অক্ষর চিনিয়েছেন, নানা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ পড়িয়েছেন।

যেমন ‘‘প্রজ্ঞাপারমিতাহৃদয়সূত্র’’, ‘‘বজ্রসূত্র’’, ‘‘লঙ্ঘনসূত্র’’, ‘‘অমৃতধর্মপদ’’ ইত্যাদি।

রাজশাও-র সবকিছু অনুধাবনের অসাধারণ প্রতিভার জন্য, সে যেকোনো কিছু একবার দেখলেই মনে রাখতে পারে।

সব গ্রন্থ সে এমনভাবে মুখস্থ করেছে, যেন নিজের প্রাণে নিবিড় ক’রে আছে, এমনকি জ্ঞানশূন্য নিজেও তার মতো এত ভালো জানেন না।

জ্ঞানশূন্য বললেন, ‘‘আমি জানি, তোমার প্রতিভা অসামান্য, পূর্বজন্মের স্মৃতি প্রবল। তবে, এ আমাদের বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি। বারবার পাঠ করলে, মন নির্মল থাকবে, অন্তর স্থির থাকবে, বাহ্যিক জিনিসে বিভ্রান্ত হবে না—এটা তোমার ভবিষ্যতে অতিমানবীয় স্তরে উত্তরণের পক্ষে উপকারী।’’

তিনি তার এই শিষ্যকে নিয়ে খানিকটা অসহায় বোধ করেন।

কারণ, এই শিষ্য ধীরে নয়, বরং এত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে!

এত দ্রুত, যা বর্ণনা করা কঠিন, প্রায় প্রতি বছর দু’টি স্তর পার হয়ে যাচ্ছে।

মাত্র দুই বছরে দেহের চর্বি, পেশী, অস্থি ও মজ্জার সাধনা সম্পূর্ণ করেছে।

যেখানে সাধারণ মানুষ সারাজীবনেও এই চারটি স্তর পেরোতে পারে না।

জ্ঞানশূন্য নিজেও এই চারটি স্তর পার হতে বিশ বছর লেগেছিল।

তবু।

নিজের শিষ্যের অতিমানবীয় গুণাবলি ভেবে, জ্ঞানশূন্য আর অস্থির থাকেন না।

এমন প্রতিভা থাকলে, দ্রুত অগ্রসর হওয়াটা স্বাভাবিক।

শুধু জানেন না, তার শিষ্য পাঁচশো বছরের অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারবে কিনা।

মায়াপথের অধিপতি ও তলোয়ারপাহাড়ের প্রধানের পর, সে-ও কি অতিমানবীয় স্তরে পৌঁছাতে পারবে!

‘‘আচ্ছা, গুরুজী, আপনি আরও জিজ্ঞাসা করুন,’’ রাজশাও দু’হাত ছড়িয়ে বলল।

তার গুরুজীর সবই ভালো, শুধু একটু একগুঁয়ে।

পাঠে যদি সবকিছু হত, তাহলে এত বছরে শুধু দু’জনই অতিমানবীয় স্তরে পৌঁছাত না।

ভাগ্যিস, গুরুজী একটু বেশি কথাবার্তা বললেও, তার প্রতি খুব ভালো।

প্রায়ই নিজের শক্তি দিয়ে তার স্নায়ু সুরক্ষিত করেন।

নানা দামী ওষুধ দিয়ে স্নান করান, একটুও কার্পণ্য করেন না।

নাহলে।

তার ‘‘সবকিছু অনুধাবনের’’ প্রতিভা থাকলেও, তিন বছর বয়সে মজ্জা সাধনা শেষ করে, অন্তঃশক্তি উৎপন্ন করা সম্ভব হত না।

দেহকে সংবরণ করা, অধিকাংশ সময় বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে।

সবকিছু অনুধাবনের প্রতিভা শুধু ওষুধের গুণাগুণের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে সাহায্য করে।

এখনও সে বেড়ে উঠছে, তবে শারীরিক সাধনার প্রথম চার স্তর আগেভাগে শেষ করায়, তার উপকারই হয়েছে।

এতে তার সামর্থ্য সীমাহীন বেড়ে যাবে, দেহের বৃদ্ধি অনুযায়ী তার ক্ষমতাও জ্যামিতিক হারে বাড়বে।

তাই, লোকমুখে প্রচলিত—‘‘সাধনা শুরু করতে হয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’’

হাড়-গোড় শক্ত হয়ে গেলে, প্রতিভা যতই হোক, ভবিষ্যতে বড় কিছু করা কঠিন।

তবে।

এখনও পর্যন্ত, কেউ শোনেনি যে, তিন বছর বয়সেই কেউ মজ্জা সাধনা শেষ করেছে।

তলোয়ারপাহাড়ের ভবিষ্যৎ প্রধানও বোধহয় পারবে না!

জ্ঞানশূন্য মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘তুমি বলো তো, এই ছয়টি শব্দের কোনটি কী কাজে ব্যবহৃত হয়?’’

রাজশাও একটু ভেবে উত্তর দিতে যাচ্ছিল।

এমন সময়—

‘‘ডং ডং ডং ডং ডং ডং ডং ডং ডং!’’

একটানা নয়বার ঘণ্টার মৃদু ধ্বনি সামনের আঙিনা থেকে ভেসে এলো।

জ্ঞানশূন্য হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল—

‘‘নয়বার ঘণ্টা বেজেছে, মানে অশুভ শক্তির আক্রমণ, আমাকে গিয়ে দেখে আসতেই হবে।’’

রাজশাও জ্ঞানশূন্য ভিক্ষুর সঙ্গে তিন বছর কাটিয়েছে, এই সময়, জ্ঞানশূন্য সর্বদাই অচঞ্চল, পাহাড় ভেঙে পড়লেও মুখাবয়ব বদলায় না।

এটাই প্রথম, রাজশাও দেখল, তার গুরু এমন অস্থির।

সে জিজ্ঞেস করল, ‘‘গুরুজী, ব্যাপারটা কি খুবই ভয়াবহ?’’

আসলে,

তিন বছর ধরে সে নিঃসংজ্ঞা মঠে আছে, বেশিরভাগ সময় আঙিনার ভেতরেই কাটায়, খুব কমই বাইরে যায়।

অশুভ শক্তি সম্পর্কে শুধু শুনেছে, কখনও দেখেনি।

জ্ঞানশূন্য বললেন, ‘‘নয়বার ঘণ্টা বাজা মানে, কোনও অশুভ শক্তির সাধক, যিনি শরীরের অভ্যন্তরীণ শক্তি সাধনায় সিদ্ধ, তিনি ঢুকে পড়েছেন। যদি তাকে মুক্তভাবে চলতে দেওয়া হয়, তবে মঠে বহু হতাহতের সম্ভাবনা, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে, তুমি এখানেই থাকো, কোথাও যেও না।’’

পিছনের পাহাড় সামনের কাছ থেকে দূরে, অচিরেই যুদ্ধের আঁচ এখানে আসবে না।

রাজশাও বলল, ‘‘গুরুজী, আমি না হয় আপনার সঙ্গে যাই?’’

তাকে দেখতে ইচ্ছা করছে, এই অশুভ শক্তির সাধকেরা আসলে কেমন।

কেন সব যোদ্ধারা তাদের নাম শুনলেই কাঁপে।

‘‘না, এই আক্রমণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ শক্তি বা অর্ধঈশ্বর স্তরে পৌঁছেছে। তুমি মজ্জা সাধনা শেষ করেছ ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই, যুদ্ধ শুরু হলে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব না। তুমি এখানে শান্তিতে থাকো, আমার ফিরে আসার অপেক্ষা করো।’’

পরিস্থিতি সংকটাপন্ন।

জ্ঞানশূন্য আর কিছু না বলেই দৌড়ে চলে গেলেন।

রাজশাও দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সে তো গুরুজীকে বলতে পারবে না, সত্যি বলতে, তার শক্তি খুবই প্রবল।

সাধারণ অভ্যন্তরীণ শক্তি সাধকও তাকে কিছু করতে পারবে না।

এই তিন বছরে, দেহ গঠন ছাড়াও, সে চুপিচুপি শক্তি সঞ্চালন করেছে, অন্তঃশক্তি পুনরুদ্ধার করেছে।

সে দেখেছে, আগের পৃথিবী আর এই পৃথিবীর সাধনার পথ ভিন্ন হলেও, কিছু মিল রয়েছে, একে অন্যকে সম্পূর্ণ করে।

এখানে দেহ গঠন যত উন্নত, অন্তঃশক্তি তত প্রবল।

আবার, অন্তঃশক্তি যত বেশি, দেহ গঠনের গতি তত দ্রুত।

এখনও সে শুধু মজ্জা সাধনা শেষ করেছে, কিন্তু তার শক্তি অনেক সাধারণ অভ্যন্তরীণ শক্তি সাধকের সমতুল্য।

তার মতে, অর্ধঈশ্বর মানে প্রবীণ যোদ্ধা, অর্থাৎ দ্বিতীয় স্তরের প্রাণী।

অভ্যন্তরীণ শক্তি সাধক, মানে যোদ্ধার দেবতা, অর্থাৎ তৃতীয় থেকে পঞ্চম স্তরের প্রাণী।

আর অতিমানবীয় স্তর, হবে পঞ্চম স্তরের প্রাণী।

ঠিক তখনই, রাজশাও অন্তঃশক্তি ঘুরিয়ে, এই দুনিয়ার কুস্তি সাধনা করতে চাইছিল।

টপ টপ টপ!

হঠাৎ, আঙিনা’র বাইরে হালকা পায়ের শব্দ শোনা গেল।

রাজশাও ঘুরে তাকিয়ে দেখল, আরেক ভিক্ষু, ঠিক তার মতো পোশাক পরে, সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে আসছে।

কিন্তু।

রাজশাও যে মুহূর্তে দেখল ভিক্ষুটির হাতে কী আছে, তার চোখ বিস্ময়ে সংকুচিত হয়ে উঠল।

একটি মুণ্ডু!

দুইটি রক্তাক্ত মুণ্ডু, ভিক্ষু হাতে ধরে আনছে।

আরও ভয়াবহ, এই মুণ্ডুগুলোর বয়সও তার মতো, তিন-চার বছরের বেশি হবে না।

দুইটি মাথাই বিকৃত, চিবানোর দাগ স্পষ্ট।

ভিক্ষু দুটি মাথা পাশে ছুঁড়ে দিয়ে, রক্তমাখা, মাংস লেগে থাকা দাঁত বের করে বলল—

‘‘ধুর! এটাই কি তোমাদের নিঃসংজ্ঞা মঠের নির্বাচিত বুদ্ধ সন্তান? এ মাংস তো একেবারেই অখাদ্য, ছোট্ট তুমি কেমন হবে কে জানে!’’

‘‘তুমিই তো সবচেয়ে সুগন্ধি শরীর, বোঝাই যাচ্ছে জ্ঞানশূন্য ভিক্ষু তোমাকে দারুণভাবে লালনপালন করেছে, তাই না?’’